বালী তাইফুর রহমান তূর্য, সমাজকর্মী ও লেখক।। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ হয়ে নতুন দেশের জন্ম।আজ তার বয়স প্রায় ৫৪ বছর।এরমধ্যে গনতন্ত্রের নামে অসংখ্য বার নির্বাচন এসেছে।দেশের শাসক বদলেছে,শাসক দল বদলেছে।শুধু বদলায়নি দেশের সাধারণ মানুষের কপাল।এদেশ একা একা গরীব হয়ে থাকেনি,একে লুট করে,চুরি করে গরীব বানিয়ে রাখা হয়েছে।এবং এই দেশকে ভিখিরি বানিয়েও রেখেছেন অতীতের অনেক রাজনৈতিক নেতারা।
৫৪ বছরেও রাস্ট্রীয় হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেই আছে হয়রানি, কিন্তু ৫৩ বছরই এখানে সাস্থ্য মন্ত্রী কেউ না কেউ ছিলো। মানুষ তার মৌলিক অধিকার, চাহিদাটুকো পায়নি আজও। এখানে হাসপাতালে গেলে বেড নেই,চিকিৎসক নেই,ঔষধ নেই,টেস্ট হাসপাতালে হবে না,পরিচ্ছন্নতা নেই, শৃঙ্খলা নেই। মানুষকে ভিটেমাটি বিক্রি করে প্রান বাচাতে হয়। সরকারি হাসপাতালে শুধু নাই আর নাই অথচ পাশের ক্লিনিকেই সব আছে। উপজেলা বা জেলার হাসপাতালে বিছানা খালি কারন সেখানে শুধু দালানটাই আছে,চিকিৎসা নেই।গেলেই বিভাগের হাসপাতালে রেফার করে দেয়। এই যে শুধু নেই আর নেই, কিন্তু সরকারি হাসপাতালে কেন নেই?সে কি ৫৩ বছর ধরে নিজেই গরীব থেকে গেছে নাকি এই ক্ষাতটিকে অনুন্নত রেখে গরীবের রক্ত নেতাদের শুষে নিতে সহযোগিতা করা হয়েছে?
এই দেশে মানুষের খাদ্যদ্রব্য কিনতে হিমসিম অবস্থা অন্তত এক দশকে অনেক বেশি বেরেছে। যা ৫৩ বছর ধরেই উথাল পাতাল ছিলো,কখনো ভাতের দাম বেরেছে নয়তো নুনের দাম, কিন্তু এখানেও এই ৫৩ বছর কেউ না কেউ মন্ত্রী ছিলো। কিন্তু দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হতে পারে নি,আমদানি করতে পারলে দাম কমে না হলে দাম আকাশছোঁয়া। এর সাথে সিন্ডিকেটের দুর্ভোগ তো আছেই। মানুষ তার এই খাদ্যসামগ্রীটাও শান্তিতে পায়নি কখনো। একদিকে কৃষক মরে আরেক দিকে ভোক্তা মরে।লাভে থাকে দালাল।
শিক্ষার উন্নতি ৫৩ বছরে কতটা হয়েছে? বিশ্বের র‍্যাংকিং তালিকায় এই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আসে না। এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে ৫৩ বছরে ৫৩ জন বিজ্ঞানী পাওয়া গেলো না।কোনো গবেষণার স্বীকৃতিও তেমন নেই। নেতা বা বড়লোকদের ছেলেরা এখানে পড়ে না, সবাই বিদেশে যায়।বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে দলীয় লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি ছাড়া খুব গর্বের কিছু ৫৩ বছরে বের হয়নি। এখান থেকে কেউ মহাকাশে যায়নি,জগদীশ চন্দ্র বসুর পরে আর কোনো বিজ্ঞানীও বের হয়নি। কিন্তু এই দপ্তরেও ৫৩ বছর কেউ না কেউ মন্ত্রী ছিলেন। এদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার বা চাহিদার এই ভাগটিও সে বুঝে পায়নি কখনো। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, কমিশন। প্রশ্ন ফাস সহ শত শত খারাপ খবর ছাড়া খুব একটা ভালো খবর এখানেও নেই।
৫৩ বছর কেটে গেছে, গনতন্ত্রের নামে কত মিছিল হলো কত প্রান গেলো।কিন্তু এখনো দেশের গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ রাস্তাঘাট কাচা। এসব গ্রামের মানুষ বর্ষাকালে মরতেও হাসপাতালে যেতে পারেন না কাদায়। বছরে এক লক্ষ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করলেও দেশের কোনো রাস্তা আর কাচা থাকার কথা না।অথচ এখানেও কেউ না কেউ ৫৩ বছর ধরেই মন্ত্রী ছিলো। এরা এমন সব লোককে কাজ দিয়েছেন রাস্তা শেষ করার আগেই রাস্তার হায়াত শেষ হয়ে যায়। কাজের মান বলতে শুধু ভাগাভাগি আর চুরি জোচ্চুরিই ছিলো। যেকারণে রাস্তা বানিয়ে রিপেয়ার করতে করতেই দেশের কোষাগার শূন্য,নতুন বানানোর গতি কচ্ছপের থেকেও ধীর।
৫৩ বছরে কত নির্বাচন এসেছে আর চলে গেছে, সাধারণ মানুষের ভাগ্য মালয়শিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো হয়নি। শুধু আফ্রিকার মতো চেপে ধরে গরীব বানিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যাংক লুট, আমদানি রপ্তানি সিন্ডিকেট, সার বীজ সিন্ডিকেট, সরকারি লুট, রাজনৈতিক লুটেই বিপর্যস্ত দেশ। যেটুকু টিকে আছে তাও প্রবাসীদের পাঠানো র‍্যামিট্যান্স আর অবশিষ্ট সামান্য রপ্তানি আয়ে। কিন্তু প্রবাসীদের দ্বারে দ্বারে হয়রানি ছাড়া রাস্ট্র তাদেরকে নূন্যতম সম্মান দিতে পারেনি ৫৩ বছর পরেও। প্রবাসে যাওয়ার নাম নিলেই লালহ লাখ টাকা লাগে। এদেশ থেকে যেই দেশে যেতে বাংলার ছয় লক্ষ টাকা দিতে হয়, সেই একই দেশে ভারত বা নেপাল থেকে এক লাখের নিচেই যাওয়া যায়।মাঝখানের টাকা লহায় দালালে। এদের থেকে শুধু শ্রমিকই যায়,অথচ পাশের দেশ ভারতও টেকনোলজি আর বড় কর্তা পাঠায়।প্রবাসে যেতে হলেই পাসপোর্ট,ভিসা,ম্যান পাওয়ার,মেডিকেল, বিএমইটি, বিমানের টিকিট, ইমিগ্রেশন এমন একটাও ধাপ নেই যেখানে হয়রানি আর ঘুষ ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যায় এখনো। একটা অথর্ব ব্যাংক বানিয়েছে রাস্ট্র প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক যা কোনো প্রবাসীর দু পয়সা উপকারে আসে না।৫৩ বছরেও এখানে কেউ না কেউ মন্ত্রী ছিলো।কিন্তু কোনো আশানুরূপ পরিবর্তন হয়নি।
খনিজেও এই দেশ একেবারে পিছিয়ে ছিলো না, গ্যাস, কয়লা এখানেও আছে। হয়তো অধিক গবেষণা করতে পারলে তেলও পাওয়া সম্ভব ছিলো। কিন্তু ৫৩ বছরেও খনিজ বলতেও চোর ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। গ্যাস আর কয়লাও চুরি চামারি করেই দেশকে ফতুর বানিয়ে ফেলেছে রাস্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আর এর পরিচালক নেতারা।বিশ্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চলে গেলেও সারা বিশ্বের ফেলে দেয়া কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাঙারি এনে এখানে চালু করা হয়েছে।শিল্প কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সংবাদ এখানেও অতি পুরনো।কুইক রেন্টাল আর ক্যাপাসিটি চার্জের নামে দেশ থেকে হাজার কোটি টাকা চলে গেছে বিদেশীদের কাছে। কেউ আটকাতে পারেনি।৫৩ বছর ধরেই এখানেও কেউ মন্ত্রী ছিলো,কিন্তু ভাগ্য ফেরেনি এদেশীদেরও।
অনেক দেশ তার স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে অনেক উন্নত হয়েছে।আমরাও হয়েছি, তবে আমাদের দেশের সম্পদে ধনী হয়েছে কানাডার বেগম পারা,লন্ডন,বেলজিয়াম,সিঙ্গাপুর, দুবাই,পানামার মতো দেশ। নেতা নামক চোরেরা দেশকে বিক্রি করে করে দেশের মানুষের রক্ত শুষে সব জমা করেছে ভিন দেশীদের কাছে। প্রতারিত হয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতার আগের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানও ম্লান করে ফেলেছিলেন তিনি এবং তার দলের নেতারা, আর সেজন্যই হয়তো তাকেও বুলেটের আঘাতে প্রান দিতে হয়েছে স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পরেই।
তবে দেশকে খাদ থেকে টেনে তুলতে চেয়েছিলেন দু একজন নায়ক,তারাও এক সময় ব্যর্থ হয়েছেন এই গনতন্ত্র গনতন্ত্র নাটকে। প্রকৃত গনতন্ত্র এখানের রাজনৈতিক দলের মধ্যেই নেই, তারা দেশের মধ্যে কিভাবে বানাবেন। ১৯৭৫ সালের পরে ইতিহাস ঘাটলে মেজর জিয়াউর রহমানের কিছু চেষ্টা ও উদ্যোগের কথা জানা যায় যা দেশের কল্যানের স্বার্থে ছিলো।তার খাল কেটে কৃষি বাচানো,বিদেশের শ্রমবাজার সৃষ্টিতে বেশ অবদান পাওয়া যায় ইতিহাস ঘাটলে।কিন্তু তাকেও বুলেটের আঘাতে প্রান দিতে হয়েছে। এরপরে তার গড়া দলটিও দুর্নীতিতে শীর্ষ অবস্থানে থাকার মতো লজ্জায়ও ডুবেছে নেতাদের জন্য। যারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামের সাইনবোর্ড লাগিয়ে তার মূল দর্শনকে পাশ কাটিয়ে দেশকে লুট করেছে তার রেখে যাওয়া দলের নেতারা।
এদেশের ইতিহাসে রাস্তাঘাট,স্টিল ব্রিজ,প্রাথমিক শিক্ষাকে মানুষের দুয়ারে পৌছাতে কাজ করেছেন জেনারেল এরশাদও বেশ অবদান রেখেছেন বলে পাওয়া যায়।কিন্তু তাকেও নির্বাচনের নামে তাকেও ধরাশায়ী করা হয়েছে। উর্দি গায়ে শুরু করলেও রাজনৈতিক দল গড়েও তিনিও আর শক্ত হয়ে নিজের দলকে দাড় করতে পারেননি। নায়ক আর খলনায়ক হিসাব নিকাশ,ক্রেডিট নেয়ার যুদ্ধ, শোক প্রস্তাব আর আলোচনায় সমালোচনায় কেটে গেছে এদেশের মানুষের ঘামে ভেজা টাকায় চলা প্রতিটি সংসদ অধিবেশন,দেশের উন্নতির আলোচনা খুব বেশি কখনোই করেনি নেতারাও।
আদালতের বারান্দায় তীর্থের কাকের মতো ঘুরে ফেরে বিচারপ্রার্থী, কেউ বা বিচারহীন বন্দী থেকেই জীবনাবসান হয়ে যায় নিরপরাধ হয়েও। অথচ এই খাতটিকে অন্তত পূর্ন স্বাধীনতা দেয়া উচিৎ ছিল। নিরাপত্তা দেয়ার শপথ নেয়া উর্দি গায়ে চালানো গুলিতে ৫৩ বছর পরেও মরতে হয় হাজার বেসামরিক মানুষকে। রাস্ট্রীয় সবকিছু যখন দলীয় গোলামে পরিনত হয় তখন মুক্তির চিৎকার ক্রমেই তীব্র হয়,কখনো কন্ঠরোধ কখনো বা নৃশংস সন্ত্রাসী আক্রমণের কাছেই আটকে যায় মুক্তির আলো। গলাবাজি, মিথ্যা বুলি, মিথ্যা স্বপ্নেই জাতীকে বিভোর রেখে লুটে নেয়া হয় দেশ, দেশের সম্পদ। সংস্কার হতে হবে এই চুরির প্রথা, রাস্ট্রের মালিকদের গড়তে হবে ঐক্য। এর বিকল্প আর নেই।
এই দেশটিও উন্নত হতে পারতো, বারবার সুযোগ এসেছে।কিন্তু প্রতিহিংসা পরায়ণ এবং জাতীগত স্বার্থপরতা আমাদেরকে ডুবিয়েছে বারবার। ৫৩ বছর পরে আরেকবার সুযোগ এসেছিলো পুরো বিশ্বে সম্মানিত ড ইউনুসের হাত ধরে। কিন্তু লোভী আর লুটের নেশায় উন্মাদ একটি গোষ্ঠীর কারনে দেশটি সেই সুযোগকেও ফের হারাতে বসেছে অচিরেই। একটি হতভাগা পতাকা,একটি হতভাগা মানচিত্র,একটি প্রতারিত মাতৃভূমি।
তাইফুর রহমান তূর্য, বরিশাল, সমাজকর্মী ও লেখক।