প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২৯, ২০২৫, ৬:৫৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ১, ২০২৫, ৩:১৯ অপরাহ্ণ
দুই বোনের দুই ইচ্ছা

দুই বোনের দুই ইচ্ছা
আর. এম. কারিমুল্লাহ
সওকত ক্লান্ত হয়ে ফিরলো দুপুরে
- কই গেল আমার দুই মেয়ে!
সুখী দুখি কই তোরা! বৃদ্ধ বাপ টা যে বাজার থেকে ফিরলো এক গ্লাস জল খাওয়া বি না? এ বাড়িতে আমাকে এক গ্লাস জল দেওয়ার লোক নেই?
সুখী ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
- কি যে বলো! তোমার জন্যে শরবত বানিয়ে অপেক্ষা করছি আর তুমি বলো তোমাকে জল দেওয়ার লোক নেই?
- আমি জানি তো আমার বড়ো মেয়ে আমার জন্য শরবত নিয়ে অপেক্ষা করবে, তোদের সাথে একটু মজা করলাম। নে তোর জন্য বাতাসা আর চুড়ি নিয়ে এসেছি।
- কেন শুধু শুধু টাকা খরচ করো? এমনিতেই তো আমাদের অভাবের সংসার, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আর তুমি আমার জন্যে চুড়ি আর বাতাসা নিয়ে আসলে! মা দেখলে রেগে যাবে।
- ঠিক আছে , তোর মায়ের জন্য তোকে অত ভাবতে হবে না,এবার যা সুখী কে ডেকে নিয়ে আয়।
- আমাকে ডাকতে হবে না এই তো আমি চলে এসেছি। তোমাকে যে বলেছিলাম আমার জন্য লাল একটা শাড়ি নিয়ে আসতে এনেছো? দাও তো দেখি পরে কেমন লাগে আমাকে !
- ক্ষমা করিস মা, আমি তোর জন্য লাল শাড়ি আনতে পারি নি । আসলে আজকে ধান বিক্রি হয়নি।
- আমি তোমার কোনো কথায় শুনতে চাইনে। তুমি গত সপ্তাহে বলেছিলে এই সপ্তাহে আমাকে একটা শাড়ি কিনে দেবে। আমি কিন্তু খুব রেগে যাচ্ছি।
- তুই এসব কি শুরু করেছিস বোন! বাবা এই মাত্র বাইরে থেকে আসলো , আর তুই কিনা তাকে শাড়ি কিনার জন্য চাপ দিচ্ছিস?
- তুমি কোনো কথা বলো না দিদি। তোমার কোনো শখ চাহিদা নেই বলে কি আমার ও থাকবে না!
তাদের চিৎকার শুনে মা গোয়াল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল-
- তোদের ব্যাপার কী! বাপ আসা মাত্রই ঘিরে ধরেছিস? যা এখান থেকে
সুখী বলল- দ্যাখো মা, বাবা আমাকে বলেছিল এই সপ্তাহে আমাকে একটি লাল শাড়ি কিনে দেবে, অথচ সে খালি হাতে ফিরে এসেছে। আমাকে শাড়ি কিনে দেয়নি।
- শুন সুখী, জীবনের অত চাহিদা চলে না ,তোর তো চাহিদা দিন দিন আকাশ ছোঁয়া হচ্ছে! তোর বড়ো বোন কে দেখে শিখ ও কখনই তোর বাপের কাছে আবদার করে না, কেন শুধু শুধু তোর এত চাহিদা!
- আমি তো দিদির মত বোকা না মা, আমি চাই ভালো আর দামি। কম জিনিসে আমার মন ভরে না, দেখে নিও একদিন আমি দিদির চেয়ে বেশি ভালো থাকবো।
- ঠিক আছে অনেক কষ্টে বাড়িতে এসেছি , দয়া করে আমাকে জ্বালাস না , আগামী সপ্তাহে তোর জন্য লাল শাড়ি নিয়ে আসবো,এবার আমাকে রেহাই দে।
- বাবা তুমি অনেক পরিশ্রম করে এসেছো , এবার এই শরবত টুকু খেয়ে একটু বিশ্রাম করো।আমি তোমার গোসলের জন্য জল দিচ্ছি।
এক ঢোকে শরবত টুকু খেয়ে স্ত্রী কে বলল- কমলা দুটো মেয়ে একেবারে দুই রকম হয়েছে, সম্পুর্ণ আলাদা ধরণের । বড়োটার কোনো চালাকি নেই ,বাবা মায়ের উপর যত্নশীল আর ছোটো মেয়ে টাকে দেখো - তার চাহিদার কোনো অন্ত নেই।
- আমিও ভাবছি, জানিনা এই দুই মেয়ের ভাগ্যে কি লেখা আছে। আর হ্যাঁ- তোমাকে তো বলতে ভুলেই গেছি- আগামীকাল আমার মা আমাদের বাড়ি তে বেড়াতে আসবে। কিছু দিন থাকবে হয়তো।
- এই তো খুব ভালো খবর। শাশুড়ি মা কয়েক দিন বাড়িতে বেড়াতে এলে আমাদের বরং ভালোই লাগবে। সকালে শাশুড়ি মায়ের জন্য বড়ো একটা মাছ নিয়ে আসবো।
সক্কাল সক্কাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে বলে-
- সুখী দুখি কোথায় তোরা? আমার নাতনি রা কোথায়?
- নানি তুমি চলে এসেছো? পথে আসতে কোনো অসুবিধা হয় নি তো! ভিতরে চলো।
ঘর থেকে কমলা বেড়িয়ে এলো।
- মা দেখো নানি এসেছে।
- মা কতদিন পরে তোমার মেয়ের বাড়িতে এলে বসো এখানে ,আমি তোমার জন্য একটু শরবতের ব্যবস্থা করছি।
- আরে দাঁড়া দাঁড়া , তোদের এত বাস্ত হতে হবে না, আমি ভালোই আছি , একবার সুখী কে ডাক দেখি- ও কোথায়?
- (রাগম্বিত কণ্ঠে) তার কী বাড়িতে থাকার সময় আছে? সারাদিন এ পাড়া ও পাড়া ঘুরে বেড়াই , যখন পেটে খুদার টান পরে তখন বাড়ি ফিরে।
পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলে- আমি এসে পড়েছি, তা বলো কেমন আছো নানি? আর আমার জন্য কি নিয়ে এসেছো?
- তুই আসলে কোনো দিন বদলাবি না, এতদিন পরে তোদের বাড়ি এলাম, আর এখুনি জিজ্ঞেস করছিস আমি তোর জন্যে কি এনেছি!
- নানি তুমি কেন এসব কথার উপর রাগ করছো? আচ্ছা ঠিক আছে , এখন বলো এতদিন পরে আমাদের বাড়ি তে কেন?
- আসার পিছনে একটা অবশ্যই কারণ আছে । আর তা হল তোর বিয়ে। আমি তোর জন্যে একটি খুউব সুন্দর ছেলের সন্ধান পেয়েছি, এই রকম ছেলের সচর আচরণ পাওয়া খুব কঠিন, আসলে তারা তোর মত চকচকে বৌ এর খোঁজ করছে, তাই ভাবলাম তোর বাবা মার গিয়ে প্রস্তাব নিয়ে যাবো।
কথা টা শেষ হতে না হতেই কমলা বলে উঠে-কি বলছো মা! দুখি আমার বড়ো মেয়ে , বড়ো । মেয়ে কে রেখে কি ভাবে ছোটোর বিয়ে দিই, তাছাড়া তুমি বিয়ের সন্ধান হটাৎ করেই!
- আমি তোদের খারাপ চাই না , সুখীর জন্য ছিল এই অনেক সুযোগ , ছেলেটা চাকরি করে, ভালো বেতুন পাই, তাহলে আপত্তি কিসের?
- কি যে বলো নানি সামান্য এক চাকরি জীবি ছেলে কে আমি বিয়ে করবো? আমি তো বড়ো লোক বংশের বড়ো লোক ছেলে কে বিয়ে করতে চাই, তুমি তো জানো ছোট্ট বেলা থেকেই আমার চাহিদা একটু বেশি, ভালো ভালো খাবার ,শাড়ি ,গহনা এসব পছন্দ করি।তুমি ওর সাথে দিদির বিয়ে দিয়ে দাও।
_ নানি আমি এতক্ষন চুপ ছিলাম, তবে একটি তোমাকে কথা বলছি আমি কিন্তু এখন বিয়ে করবো না, আমি আমার বাবা মার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাই।
- আশা করি তোদের মধ্যে যে কোনো একজন রাজি হবি, আমি বিয়ে টা দিতে চাই, তোর বাবা মা আমার উপর ভরষা করে, তাদের কোনো অভাব থাকবে না, আর আগামীকাল পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে তোরা প্রস্তুত থাকিস।
সমস্ত খবর জানতে পারলেন সওকত । তোদের নানিমা এত সুন্দর প্রস্তাব নিয়ে এসেছে রাজি কেন হচ্ছিস না মা! আমরা গরিব মানুষ, গরিবের যদি ভালো বাড়িতে বিয়ে হয় তাহলে তো আমাদের সৌভাগ্য, সংসার সুখী হবে।
- তোমরা তো ভালো করে জানো আমার সম্মন্ধে, এরকম সাধারণ চাকরি জীবি ছেলে কে বিয়ে করতে চাইনা, আমি এমন একজন কে বিয়ে করবো সে হবে অনেক বড়ো লোক, এবং টাকা পয়সার মালিক।
- সম্পত্তির লোভ ভালো না, তাছাড়া ছেলে টা অনেক ভালো তোকে সুখে রাখবে।
- যাক বাবা, আমি ওদের কে কথা দিয়ে এসেছি, সুখী যদি না বিয়েতে রাজি হয় তাহলে দুখি কে রাজি করাও।
- দুখি , তুই ছোট্ট বেলা থেকেই কখনই আমার কথার অবাধ্য হোসনি, এই বিয়েতে তোর মত আছে?
- আমি তো চেয়েছিলাম সারা জীবন তোমাদের পাশে থাকতে ,সুখে দুখে সর্বদায় সাহায্য করতে, এখন তোমরা যা ভালো মনে করো ।
- এই দুনিয়ার কোনো মেয়ে তার বাবা মার সঙ্গে সারা জীবন থাকবে না।
- ঠিক আছে শাশুড়ি মা, আপনি তাহলে ঐ ছেলে কে বলে দেন , আগামীকাল যেন তারা দেখতে আসে।
পরদিন ঘটক সহ ছেলে টি দুখি কে দেখতে আসলো।
- আমার নাম হাসান, খুব ছোট্ট বেলায় বাবা মা মারা গেছে , আমি আমার চাচা চাচির কাছেই মানুষ হয়েছি।
- দেখো বাবা, বড়ো মেয়ের বিয়ে না দিয়ে ছোট মেয়ের বিয়ে কি ভাবে দিই? যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে তুমি দুখি কে বিয়ে করো।
- চাচা, আমি শুধু একটি ভালো মেয়ে চাই, আর কোনো চাহিদা নেই আমার , দুখির যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমার সমস্যা নেই।
একটি শুভ দিন ধার্য করা হল বিয়ের জন্য, সবাই উঠে চলে গেল সেই সুযোগে সুখী দুখির ঘরে গিয়ে বলে-
তোর মত বোকা মেয়ে এই পৃথিবীতে নেই। কি কারণে ঐ ছেলে কে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিস? তুই জানিস ছেলেটার ঘর বাড়ি নেই , টাকা পয়সা কিছুই নেই, তেমন রোজগার ও করে না!
- ছোট্ট বেলা থেকে তুই তো আমাকে এসেছিস, কখনো দেখেছিস আমাকে টাকা পয়সা চাইতে? এই সবের কিছুই আমার লোভ নেই , শুধু মাত্র একটা ভালো মানুষ চাই।
- জীবনে টাকা পয়সা ছাড়া কিছুই দাম নেই, যখন টাকা পয়সা থাকবে না, তখন দেখবি জীবনের কিছুই দাম নেই।
- সৃষ্টি কর্তার কাছে দুয়া করি, তোর যেন ভালো ঘরে বিয়ে হয়, তুই যেন সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারিস এই চাওয়া।
- আমি মন স্থির করে ফেলেছি- কখনই গরিব ছেলে কে বিয়ে করবো না, যাকে বিয়ে করবো তাকে থাকতে হবে অনেক ধন সম্পত্তির অধিকারি ।
- সৃষ্টি কর্তা তোর মনের আশা পূরণ করুক , আর মাত্র কয়েক দিন বাকি , এরপর বিয়ে হয়ে গেলে স্বামীর ঘরে চলে যাবো।
- বাড়ি তে যাওয়ার জন্য তো হা করে আছিস, গিয়ে দেখবি যখন নুন আনতে পান্তা ফুরাবে তোর ভালোবাসা বের হয়ে যাবে বুঝতে পারলি!
- আচ্ছা, ঠিক আছে , এখন এসব কথা থাক ভবিষ্যৎ কি হবে তা সৃষ্টি কর্তা নির্ধারিত করে দিয়েছে, এখন চল রান্না বান্না শেষ করি।
- তুই গিয়ে রান্না কর, আগুনের ঝাসে বসে আমি রান্না করতে পারবো না ,তাতে আমার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে ,আমি তো তোর মত গরিব ঘরের বৌ হবো না, আমি বড়ো লোক ঘরের সুন্দরী বৌ হবো, আমার চার- পাঁচ টা দাসি বাদী থাকবে।
- আচ্ছা যা, তোকে রান্না করতে হবে না, তুই তোর ইচ্ছা যত ঘুরে বেড়া, আমি বরং একা রান্না শেষ করি।
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ রিসালাত মীরবহর। অফিস: বরিশাল সদর, বরিশাল, বাংলাদেশ। www.obalardak.com, E-mail: obalardak@gmail.com, Contact: +8801516332727
Copyright © 2025 | অবেলার ডাক